
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কাজ দেওয়ার জন্য ঠিকাদারের কাছ থেকে ৯ শতাংশ ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগ খণ্ডন করতে বুধবার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলন শেষে পছন্দের গণমাধ্যমকর্মীদের খাম দেওয়া হয়েছে, তাতে ছিল ৫০০ টাকা।
সংবাদ সম্মেলন শেষে রামেবির সহকারী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) এবং ভিসির ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন তাঁর কক্ষে পছন্দের গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে ডেকে খাম দেন। এছাড়া পরবর্তীতে কারও কারও কাছে খাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অন্তত ৮০ ভাগ গণমাধ্যমকর্মীকে খাম দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন নাজমুল হোসেন।
সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া একজন গণমাধ্যমকর্মী জানান, সংবাদ সম্মেলনে ভিসি কথা শেষ করার আগে আগে ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন তাঁর কক্ষে গিয়ে বসেন। সেখান থেকে তিনি খাম বিতরণ করেন। সাদা রঙের ওই খামে ৫০০ টাকা ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে একজন গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় দিয়ে নাজমুল হোসেনকে বলা হয়, তিনি সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছেন; কিন্তু খাম পাননি। তখন ভিসির সহকারী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আসেন, কালকে একপাক আসেন। সবাই না। শোনেন, আপনারা যারা মূলধারার সাংবাদিক, এর বাইরে এত পরিমাণ এসেছে...। আপনার কাছে এমনিতেও ফোন যেত। কালকে আপনি একপাক আসেন। এখানে পর্যায়ক্রমে আমি নিজেই সবাইকে ফোন করছি এবং মোটামুটি আপনারা যারা রেপুটেড পত্রিকায় আছেন, আমার এইটটি পার্সেন্ট কমপ্লিট হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, ‘ভিসির বিরুদ্ধে এখন ঠিকাদারের কাছে ৯ পার্সেন্ট কমিশন নেওয়ার অভিযোগ। সেই মূহুর্তে সংবাদ সম্মেলন ডেকে গণমাধ্যমকর্মীদের টাকার খাম দেওয়া মানে তাদের খুশি রাখার চেষ্টা। আমরা নৈতিকভাবে এটা সমর্থন করি না। কারণ, এই টাকার উৎস কী সেটা আমরা জানি না।’
পছন্দের গণমাধ্যমকর্মীদের খাম দেওয়ার বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘৫০০ টাকায় কি গণমাধ্যমকর্মীদের খুশি করা যায়? এটা কিছু না। জাস্ট ইফতারি করার জন্য দেওয়া হয়েছে। এটা আমি জরুরিভাবে আমার ব্যক্তিগত সহকারীকে দিতে বলেছিলাম। সে কোন খাত থেকে টাকাটা দিয়েছে তা জানি না। কালকে গিয়ে বলতে পারব।’
ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের খরচের জন্য ভিসির একটা খাত থাকে। প্রতিবছর একটা বরাদ্দ পাওয়া যায়। সেই খাত থেকেই টাকাটা গণমাধ্যমর্কীদের দেওয়া হয়েছে।’
ভিসি জাওয়াদুল হক রামেবির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ছয়টি প্যাকেজে ৭৭৭ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করেছেন। এসব কাজ দিতে ঠিকাদারের কাছ থেকে ৯ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ঢাকার জেনিট কর্পোরেশন নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী আতাউর রহমান টিপুর দাবি, দরপত্রের মাধ্যমেই ভিসি তাকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিনিময়ে চেয়েছিলেন ৯ শতাংশ কমিশন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়।
অনেকেই ভিসির অপসারণ দাবি করছেন। এ দাবিতে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরের সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ‘সচেতন রাজশাহীবাসী’র ব্যানারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেখানে জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাইদুর রহমান ঘোষণা দেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে ভিসি জাওয়াদুল হককে অপসারণ করতে হবে। তা না হলে ভিসির দপ্তর ঘেরাও করা হবে।
তিনি বলেন, ‘ভিসির আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ভরা। তিনি দায়িত্ব নিয়েই ক্যাম্পাসের কয়েক হাজার গাছের আম লুট করলেন। টেন্ডার ছাড়াই কয়েক হাজার গাছ কাটলেন। পরে শত কোটি টাকার গাছ নামমাত্র মূল্যে একটা সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিলেন। এখন আবার ৭৭৭ কোটি টাকার কাজ দিতে ঠিকাদারের কাছ থেকে ৯ পার্সেন্ট কমিশন চেয়েছেন। এই দুর্নীতিগ্রস্ত ভিসিকে তিন দিনের মধ্যে অপসারণ করা না হলে তাঁর দপ্তর আমরা ঘেরাও করব।’
কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন- ক্যাবের রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান বরজাহান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আসলাম-উদ-দৌলা, সামাজিক সংগঠক সালাহউদ্দিন মিন্টু, ব্যবসায়ী নেতা শফিকুর রহমান প্রমুখ।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর এ দিন সকালেই নিজের দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করেন ভিসি জাওয়াদুল হক। সেখানে তিনি বলেন, যে দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা এখনও পর্যন্ত রামেবির কোনো কাজই করেনি। তাই তাদের কাছে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ হাস্যকর। তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই সবকিছু করছেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি কোনো অনিয়ম করেননি বলেও দাবি করেন।
তবে গণমাধ্যমকর্মীরা নানা অনিয়মের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে শুরু করলে তিনি দ্রুত সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ ইভান শাহরিরায় চৌধুরী তাশদিক, বার্তা সম্পাদকঃ এফ, এম, শামসুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৭১, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
All rights reserved © 2019 deshbortoman.com